ডায়াবেটিস রোগীর সিয়াম পালনের নিয়ম

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১৫:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০২৩
  • ১৬৭০ বার পড়া হয়েছে

অনেকেরই ধারণা ডায়াবেটিসে আক্রান্তরা রোজা রাখতে পারবেন না। এটি ভুল ধারণা। সব মুসলিমের মতো ডায়াবেটিসের রোগীও রোজা রাখতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে রমজানের তিন মাস আগে থেকেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

ডায়াবেটিক রোগী রোজা রাখতে কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে-

  • ডায়াবেটিসের ওষুধ কোন নিয়মে খেতে হবে, তা আপনার ডায়াবেটোলজিস্টের কাছ থেকে জেনে নেবেন।
  • ‘হাইপো’ বা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে রোজা ভেঙে চিনির শরবত, খাবার খেতে হবে।
  • খাবারের পরিমাণ ডায়াবেটিস রোগীর স্বাভাবিক খাবারের মতো হবে।
  • ইফতার, রাতের খাবার, সেহরি তিনবেলায়ই খেতে হবে।
  • সেহরির শেষ সময়ের আগে আগে খেলে ভালো।
  • পরিপূর্ণ খাবার খেতে হবে। ডায়াবেটিসের রোগীর অল্প পরিমাণে খাবার খেয়ে রোজা রাখা উচিত নয়।
  • রমজান মাসে ডায়াবেটিসের রোগী রোজা পালন করলে ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। তারাবিসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করাই যথেষ্ট।
  • বেশি সমস্যা দেখা দিলে ডায়াবেটোলজিস্টের পরামর্শ নেবেন

 

রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীর খাবার-দাবার

ইফতার :
শরবত খেতে পারেন। আনারস, জাম্বুরা, জাম, কমলা, মাল্টার রস আধা গ্লাস, সঙ্গে এক চা-চামচ লেবুর রস ও আধা গেলাস পানি আর মিষ্টি স্বাদের জন্য স্যাকারিন বা স্যুকরালোজ জাতীয় ট্যাবলেট গুলে নিতে পারেন।
 
লাচ্ছি খেতে পারেন। চিনিছাড়া দই অথবা টকদই দিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন। যথারীতি মিষ্টি স্বাদের জন্য স্যাকারিন বা স্যুকরালোজ জাতীয় ট্যাবলেট গুলে নিতে পারেন।
 
পাঁকা কলা, আম, পেঁপের যেকোনো একটি দুধের সঙ্গে মিশিয়ে মিল্কসেক বানিয়ে খেতে পারেন।
ইফতারে অন্যান্য খাবার :
ফল :
খেঁজুর ২-৩ টা।
মিষ্টি ফল : কলা, আতাফল, কমলা, আপেল, মাল্টা যেকোনো ১টি ফল।
লিচু ৬টি। কাঁঠাল ৩-৪ কোয়া।
শশা, খিরা, গাঁজর, কাচা পেয়ারা ইচ্ছে মতো খেতে পারেন।
ইফতারে ভারি খাবার হিসেবে :
বুট ভুনা : আধাকাপ বা এক কাপ, মুড়ি ২-৩ কাপ, পিঁয়াজু ২-৩টা, হালিম।
অথবা
চিড়া ভিজানো : ২ কাপ, কলা ১টা, দই ১ কাপ।
অথবা
পরাটা, পুরি, মাংস, ডাল, সবজি।
অথবা
ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি।
রাতের খাবার (রাত ৯টা-১০টা) :
ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ।
অথবা
আটার রুটি, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ।
(দুই পদের যেকোনো একটি পদ।)
সেহরিতে খাবার
ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ, ফল।
অথবা
আটার রুটি, পাউরুটি, মাছ-মাংস, ডাল, সবজি, দুধ।
 
 
রমজানে রক্তে শর্করা পরিমাপ
রমজানের প্রথম কয়েক দিন পাঁচ বেলা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিতভাবে পরিমাপ করতে হবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর, সকাল ১১টায়, বিকেল ৪টায়, ইফতারের ঠিক আগে এবং ইফতারের দুই ঘণ্টা পরে। এসব পরীক্ষার ফলাফল দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ওষুধ ও খাদ্যের সমন্বয় করে নিতে হবে।
 
রমজানে ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা
ডায়াবেটিসের রোগী রোজা রেখে ইনসুলিন ব্যবহারে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে।
যারা ‘প্রিমিক্স’ জাতীয় ইনসুলিন অর্থাৎ দুই বেলার ইনসুলিন নেন, তারা সকালের ডোজ যতটুকু নির্দেশিত ছিল ইফতারের আজান হলে ঠিক সে মাত্রায় ইনসুলিন নেবেন। যেমন, কেউ যদি সকালের নাশতার আগে ১৪ ডোজে ইনসুলিন গ্রহণ করতেন, ইফতারের সময়ে ঠিক ততটুকু ডোজে ইনসুলিন গ্রহণ করবেন। এক্ষেত্রে ইফতার খাওয়ার আগে ২০-৩০ মিনিট অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। তেমনি ডায়াবেটিসের যেসকল রোগী রমজানের আগে রাতের ইনসুলিন গ্রহণের ডোজ ১০ ছিল, তারা সাহরির আগে রমজানের আগের ডোজের অর্ধেক অর্থাৎ ৫ ডোজ পরিমাণ ইনসুলিন গ্রহণ করে ২০-৩০ মিনিট পর সেহরি করবেন।
 
আবার কেউ যদি রমজানের আগে থেকেই তিন বেলার অর্থাৎ ‘বেসাল বোলাস’ জাতীয় ইনসুলিন গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে সকালের ডোজের ইনসুলিন সমপরিমাণ ডোজ ইফতারের সময়ে, দুপুরের ইনসুলিন রাতের খাবারের (রাত ৯টা-১০টা) সময়ে আর রাতের ইনসুলিন অর্ধেক ডোজ সেহরির সময়ে নিতে হবে। ইফতার আর সেহরির মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ রাতের খাবার না খেলে রাতের ডোজের ইনসুলিন গ্রহণেরও প্রয়োজন নেই।
 
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কোনো রোগী যদি ‘বেসাল ইনসুলিন’ অর্থাৎ রাতের এক বেলার ইনসুলিন আগে থেকে গ্রহণ করেন তাহলে রমজান মাসের গাইডলাইন অনুযায়ী ইফতারের সময়ে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম ডোজে ইনসুলিন গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছ।
 
উপরোক্ত বিষয়গুলো বুঝতে না পারলে আপনার ডায়াবেটোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
 
 
কখন রোজা ভাঙতে হবে?
 
সতর্কতার সাথে রোজা রাখার পরেও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে। প্রতি লিটারে ৩ দশমিক ৯ মিলিমোলের নিচে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নেমে গেলে গ্লুকোজ বা চিনির শরবত পান করে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়েও যেতে পারে। তাহলেও সমস্যা। ১৬ দশমিক ৬ মিলিমোলের ওপরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে রোজা ভেঙে ফেলবেন। তাতে যদি ইফতারের অল্প কিছু সময় বাকি থাকে, তাতেও রোজা ভেঙে ফেলতে হবে।
 
ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ডায়াবেটিস রোগীর সিয়াম পালনের নিয়ম

আপডেট সময় : ০৬:১৫:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০২৩

অনেকেরই ধারণা ডায়াবেটিসে আক্রান্তরা রোজা রাখতে পারবেন না। এটি ভুল ধারণা। সব মুসলিমের মতো ডায়াবেটিসের রোগীও রোজা রাখতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে রমজানের তিন মাস আগে থেকেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

ডায়াবেটিক রোগী রোজা রাখতে কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে-

  • ডায়াবেটিসের ওষুধ কোন নিয়মে খেতে হবে, তা আপনার ডায়াবেটোলজিস্টের কাছ থেকে জেনে নেবেন।
  • ‘হাইপো’ বা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিলে রোজা ভেঙে চিনির শরবত, খাবার খেতে হবে।
  • খাবারের পরিমাণ ডায়াবেটিস রোগীর স্বাভাবিক খাবারের মতো হবে।
  • ইফতার, রাতের খাবার, সেহরি তিনবেলায়ই খেতে হবে।
  • সেহরির শেষ সময়ের আগে আগে খেলে ভালো।
  • পরিপূর্ণ খাবার খেতে হবে। ডায়াবেটিসের রোগীর অল্প পরিমাণে খাবার খেয়ে রোজা রাখা উচিত নয়।
  • রমজান মাসে ডায়াবেটিসের রোগী রোজা পালন করলে ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। তারাবিসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করাই যথেষ্ট।
  • বেশি সমস্যা দেখা দিলে ডায়াবেটোলজিস্টের পরামর্শ নেবেন

 

রোজাদার ডায়াবেটিস রোগীর খাবার-দাবার

ইফতার :
শরবত খেতে পারেন। আনারস, জাম্বুরা, জাম, কমলা, মাল্টার রস আধা গ্লাস, সঙ্গে এক চা-চামচ লেবুর রস ও আধা গেলাস পানি আর মিষ্টি স্বাদের জন্য স্যাকারিন বা স্যুকরালোজ জাতীয় ট্যাবলেট গুলে নিতে পারেন।
 
লাচ্ছি খেতে পারেন। চিনিছাড়া দই অথবা টকদই দিয়ে বানিয়ে নিতে পারেন। যথারীতি মিষ্টি স্বাদের জন্য স্যাকারিন বা স্যুকরালোজ জাতীয় ট্যাবলেট গুলে নিতে পারেন।
 
পাঁকা কলা, আম, পেঁপের যেকোনো একটি দুধের সঙ্গে মিশিয়ে মিল্কসেক বানিয়ে খেতে পারেন।
ইফতারে অন্যান্য খাবার :
ফল :
খেঁজুর ২-৩ টা।
মিষ্টি ফল : কলা, আতাফল, কমলা, আপেল, মাল্টা যেকোনো ১টি ফল।
লিচু ৬টি। কাঁঠাল ৩-৪ কোয়া।
শশা, খিরা, গাঁজর, কাচা পেয়ারা ইচ্ছে মতো খেতে পারেন।
ইফতারে ভারি খাবার হিসেবে :
বুট ভুনা : আধাকাপ বা এক কাপ, মুড়ি ২-৩ কাপ, পিঁয়াজু ২-৩টা, হালিম।
অথবা
চিড়া ভিজানো : ২ কাপ, কলা ১টা, দই ১ কাপ।
অথবা
পরাটা, পুরি, মাংস, ডাল, সবজি।
অথবা
ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি।
রাতের খাবার (রাত ৯টা-১০টা) :
ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ।
অথবা
আটার রুটি, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ।
(দুই পদের যেকোনো একটি পদ।)
সেহরিতে খাবার
ভাত, মাছ, মাংস, ডাল, সবজি, দুধ, ফল।
অথবা
আটার রুটি, পাউরুটি, মাছ-মাংস, ডাল, সবজি, দুধ।
 
 
রমজানে রক্তে শর্করা পরিমাপ
রমজানের প্রথম কয়েক দিন পাঁচ বেলা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিতভাবে পরিমাপ করতে হবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর, সকাল ১১টায়, বিকেল ৪টায়, ইফতারের ঠিক আগে এবং ইফতারের দুই ঘণ্টা পরে। এসব পরীক্ষার ফলাফল দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ওষুধ ও খাদ্যের সমন্বয় করে নিতে হবে।
 
রমজানে ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা
ডায়াবেটিসের রোগী রোজা রেখে ইনসুলিন ব্যবহারে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে।
যারা ‘প্রিমিক্স’ জাতীয় ইনসুলিন অর্থাৎ দুই বেলার ইনসুলিন নেন, তারা সকালের ডোজ যতটুকু নির্দেশিত ছিল ইফতারের আজান হলে ঠিক সে মাত্রায় ইনসুলিন নেবেন। যেমন, কেউ যদি সকালের নাশতার আগে ১৪ ডোজে ইনসুলিন গ্রহণ করতেন, ইফতারের সময়ে ঠিক ততটুকু ডোজে ইনসুলিন গ্রহণ করবেন। এক্ষেত্রে ইফতার খাওয়ার আগে ২০-৩০ মিনিট অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। তেমনি ডায়াবেটিসের যেসকল রোগী রমজানের আগে রাতের ইনসুলিন গ্রহণের ডোজ ১০ ছিল, তারা সাহরির আগে রমজানের আগের ডোজের অর্ধেক অর্থাৎ ৫ ডোজ পরিমাণ ইনসুলিন গ্রহণ করে ২০-৩০ মিনিট পর সেহরি করবেন।
 
আবার কেউ যদি রমজানের আগে থেকেই তিন বেলার অর্থাৎ ‘বেসাল বোলাস’ জাতীয় ইনসুলিন গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে সকালের ডোজের ইনসুলিন সমপরিমাণ ডোজ ইফতারের সময়ে, দুপুরের ইনসুলিন রাতের খাবারের (রাত ৯টা-১০টা) সময়ে আর রাতের ইনসুলিন অর্ধেক ডোজ সেহরির সময়ে নিতে হবে। ইফতার আর সেহরির মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ রাতের খাবার না খেলে রাতের ডোজের ইনসুলিন গ্রহণেরও প্রয়োজন নেই।
 
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কোনো রোগী যদি ‘বেসাল ইনসুলিন’ অর্থাৎ রাতের এক বেলার ইনসুলিন আগে থেকে গ্রহণ করেন তাহলে রমজান মাসের গাইডলাইন অনুযায়ী ইফতারের সময়ে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম ডোজে ইনসুলিন গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়েছ।
 
উপরোক্ত বিষয়গুলো বুঝতে না পারলে আপনার ডায়াবেটোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
 
 
কখন রোজা ভাঙতে হবে?
 
সতর্কতার সাথে রোজা রাখার পরেও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যেতে পারে। প্রতি লিটারে ৩ দশমিক ৯ মিলিমোলের নিচে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নেমে গেলে গ্লুকোজ বা চিনির শরবত পান করে রোজা ভেঙে ফেলতে হবে। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়েও যেতে পারে। তাহলেও সমস্যা। ১৬ দশমিক ৬ মিলিমোলের ওপরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে রোজা ভেঙে ফেলবেন। তাতে যদি ইফতারের অল্প কিছু সময় বাকি থাকে, তাতেও রোজা ভেঙে ফেলতে হবে।